বুধবার ০৬ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৩শে বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৯ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি
LIVE
Printed on: May 06, 2026
March 25, 2026
সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

‘মহানন্দার নীল আলো’

Published: March 25, 2026 at 04:31 AM
‘মহানন্দার নীল আলো’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সেই মফস্বল শহর— যেখানে ভোরের কুয়াশা নামলে মনে হয় শহরটাকে কেউ তুলোর চাদরে ঢেকে রেখেছে। আজও সেরকম ভোর। কিন্তু বাতাসে যেন অদ্ভুত উত্তেজনা। কারণ আজ রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএমের জন্মদিন। স্টেশনের ভেতরে তখন টানটান ব্যস্ততা। লাইট, মাইক্রোফোন, সাউন্ড চেক, অতিথিদের তালিকা— সবকিছুই চলছে ধুমধাড়াক্কা তালে। স্টুডিওর দেয়ালে ঝুলছে আগের বছরের সম্মাননা। এক কোণে সিলভার ফ্রেমে লাগানো আছে মহানন্দার প্রথম দিনের সম্প্রচারের ছবি।
এই ব্যস্ততার ভিড়ে স্টেশনের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোর— রাফি। চোখে ভয়, হাতে একটা পুরোনো খাম, গলায় কাঁপা আওয়াজ। রাফি আজ বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে। কারণ তার বাবা চায় না, সে ‘ফালতু রেডিও-টেডিও’ নিয়ে সময় নষ্ট করুক। কিন্তু রাফির স্বপ্নটা ছোট কিছু নয়— তার গল্প একদিন রেডিওতে পড়া হবে। বাবার রাগ, দারিদ্র্য, নিজের ভয়— সবকিছুর সঙ্গে লড়েই সে আজ দাঁড়িয়ে আছে রেডিও মহানন্দার সামনে। খামটি শক্ত করে ধরে সে দরজায় নক করল।
ভেতর থেকে বের হলেন আরজে রূপক। “হ্যাঁ, বলো? তোমাকে কোথাও দেখিনি তো।”
রাফির গলা শুকিয়ে গেল। “আমি… আমি একটা গল্প লিখেছি… যদি… যদি আপনারা পড়েন…।”
আরজে রূপক প্রথমে ব্যস্ততার চাপে গুরুত্ব দিলেন না। কিন্তু রাফির চোখের ভেতরের আগুনটা তাকে থামিয়ে দিল। তিনি খাম খুলে কয়েক লাইন পড়তেই থমকে গেলেন।
গল্পে লেখা— “মহানন্দা শুধু নদীর নাম নয়, একটা স্বপ্নের সেতু। যেখানে দুঃখেরা স্রোতে ভাসে, আর মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে আলো।”
এই লাইন পড়ে তার শরীর কেঁপে উঠল। এমন লেখা একজন কিশোর লিখেছে? রাফিকে নিয়ে তিনি ভেতরে ছুটলেন। “সবাই শোন! আজকের লাইভে আমরা একটা চমক দিচ্ছি। এই ছেলেটার গল্প… লাইভে পড়ব!”
স্টুডিওতে উত্তেজনার ঝড় উঠে গেল। লাইভ শুরু হতে আর ৫ মিনিট। হঠাৎ স্টেশনের ফোন বেজে উঠল। ফোনের ও-প্রান্তে রাফির বাবা। রাফির বাবা রেগে বললেন, “আমার ছেলে কি তোমাদের স্টেশনে? ওকে পাঠাও! আমার ছেলে রেডিও করবে না!”
সবাই স্তব্ধ। রাফির চোখ ভিজে ওঠে। সে মাইক্রোফোন থেকে সরে যেতে চায়। কিন্তু রূপক তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “স্বপ্নের দরজা আজ খুলেছে, আজ তুমি পেছনে ফিরবে না।”
ঘড়িতে সময় সকাল ১০টা ৩০ মিনিট। লাইভ সিগন্যাল জ্বলে উঠল। স্টুডিওর লাল আলো জ্বলে উঠতেই পুরো শহর যেন কান পেতে রইল।
রূপক বললেন, “প্রিয় শ্রোতা, রেডিও মহানন্দার জন্মদিনে আজ আমরা শুনব এক তরুণ স্বপ্নবাজের গল্প— ‘মহানন্দার নীল আলো’। লেখক-রাফি।”
গল্প পড়া শুরু হলো। গল্পে ছিল অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা, আর ছিল রেডিও মহানন্দার সুর, যা তাদের আলো দেখায়। গল্পের শেষে এক লাইন— “কেউ যদি এক মুহূর্তের জন্যও আলো দেখায়, তবে সে মহানন্দা।”
স্টুডিওর সবাই নিস্তব্ধ। এই সময় আবার ফোন আসে। এবারো রাফির বাবা। সবাই ভয় পায়। কিন্তু ফোনে শোনা যায় এক কাঁপা গলা— “রূপক ভাই… গল্পটা শুনেছি। আমার ছেলে… আমার ছেলে এমন লিখে? ওকে… ওকে এগোতে দিন। আজ থেকে আমিও রেডিও মহানন্দার শ্রোতা।”
স্টুডিওতে কেউ হাসল, কেউ কেঁদে ফেলল। রাফি মাথা নিচু করে ছিল; চোখের জল গড়িয়ে গালে পড়ল।
রূপক বললেন, “শুভ জন্মদিন রেডিও মহানন্দা। আর শুভ জন্মদিন সেই সব স্বপ্নদের, যাদের আমরা কণ্ঠ দিই।”
শহরের মানুষ সেই রাতেই রেডিওর বারান্দায় এসে রাফিকে দেখে হাততালি দিল। মনে হলো— আজ শুধু রেডিও মহানন্দার জন্মদিন নয়, রাফির জীবনের নতুন ভোরও ফুটে উঠল।

মোসা. সুপ্রিয়া আক্তার : সহকারী অনুষ্ঠান প্রযোজক, রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম